ছেঁড়া তার (P1)

গাড়িতে উঠে পেছনের সীটে গা এলিয়ে দিলো তিতাস, ক্লান্ত লাগছে খুব।
“এখান থেকে কাঁথি পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগবে দীপু দা?”
“তা ঘন্টাতিনেক তো লাগবেই”।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিতাস আবার গা এলিয়ে বসলো সীটে। তিনদিন ছুটি চেয়েছিলো বলে আজ একেবারে নিংড়ে নিয়েছে অজিত দা। অজিত দা তিতাসের নতুন মেগার ডিরেক্টর। একেবারে কাজ পাগল একটা লোক। ভীষণ serious, ভীষণ Passionate। প্রায় ২.৫ বছর হলো তিতাস কাজ করছে অজিত দার সাথে, আর যত দিন গেছে কেমন যেন একটু একটু করে ভালোবেসে ফেলেছে লোকটার এই পাগলামোকে, যতক্ষণ সিন চলে একমুহূর্তের জন্যও ক্লান্ত লাগেনা তিতাসের। কি অসাধারণ করে বোঝায়, কি অসাধারণ করে একজন অভিনেতা-অভিনেত্রীর ভেতর থেকে সেরাটাকে খুঁচিয়ে বের করে আনে। কি অসম্ভব confidence… তাই প্রথমে যখন অলির invitation টা পেয়েছিলো, তখন তিনদিন কাজ অফ্ করে কলকাতা থেকে এতদূরে যাওয়ার ইচ্ছে হয়নি একটুও…..

” দীপু দা ac টা একটু বন্ধ করে দাও না”।
“কেন গো? ঠান্ডা লাগালে নাকি!”
“আরে না, কোলকাতা থেকে তো বেরিয়ে এসেছি, এদিকটা কত গাছ… একটু বাইরের হাওয়া খেতে ইচ্ছে করছে।”
গাড়ির কাঁচ নামিয়ে মুখ বের করলো তিতাস। আহ্……….. মুক্ত হাওয়ায় যেনো বুক ভরে নিশ্বাস নিলো একটু। শরীরের ক্লান্তি অনেকটা কমে গেলো যেনো। প্রায় ফাঁকা রাস্তা দিয়ে প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভেঙে ছুটছে তিতাসের গাড়ি। প্রথমটা যাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও এখন বেশ ভালোলাগছে। কতদিন পর সবার সাথে দেখা হবে।
আচ্ছা, সাবর্ণ আসবে আজ……. সাবর্ণর সাথে শেষ দেখা প্রায় তিনবছর আগে। ও কি এখনোও আগের মতোই আছে! নাকি বদলে গেছে। আজ কি ওর জন্যই ছুটে যাচ্ছে তিতাস কোলকাতা ছেড়ে এতদূরে!!! নিজের মনকেই প্রশ্ন করে তিতাস…. কিন্তু উত্তর নেই ওর নিজের কাছেও….

চমক ভাঙে তিতাসের হঠাৎ, ফোনটা ভাইব্রেট করছে। তড়িঘড়ি ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে কানে দেয় তিতাস,
“হ্যাঁ মা, না না এখনো পৌঁছায়নি তো। পৌঁছে ফোন করবো…… হ্যাঁ খেয়েই উঠেছি….. না ওদের বলা আছে তো যে রাত হবে…. তুমি চিন্তা কোরোনা আমি পৌঁছে জানাবো….না না দীপু দা কাল সকালে বাড়ি চলে যাবে, তিনদিন পর নিতে আসবে…. এতদিন এখানে থাকার দরকার নেই…। “
ফোনটা রেখে নেট টা অন করে তিতাস। এবাবা, অলির অনেকগুলো মেসেজ তো….. তিতাস বেরিয়েছে কিনা, কি অবস্থায় আছে বুঝতে পারছেনা বলে phn না করে whatsapp করেছে একগাদা, ওর আসতে কটা হবে তাই জানতে চেয়ে। দীপু দার কাছ থেকে এই জায়গাটার নাম আর কতক্ষণ লাগবে জেনে নিয়ে অলির number টা dial করে কানে দেয় তিতাস….
ওপাশ থেকে অলি ধমক মেশানো গলা,

” কি রে, কখন থেকে whatsapp করছি, একটা ফোন করবি তো বেরিয়ে!”
“আরে নেটটা অফ ছিলো, আমি একদম খেয়াল করিনি রে, এখন দেখে সাথে সাথে ফোন করলাম। আমি প্রায় চলেই এসেছি, আর ঘন্টাখানেক লাগবে”।
” এসে খাবি তো?”
“হ্যাঁ, ঐ কিছু একটা অল্প করে রাখলেই হবে, আসলে দীপু দাও আছে। মানে এতটা রাস্তা কিসে আসবো তাই গাড়ি নিয়েই যাচ্ছি….. “
“আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে, সব ব্যাবস্থা আছে তুই আয়, সবাই এসে গেছে, খুব মিস করছি তোকে….”

“স-সবাই মানে?” বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ি পিটতে থাকে তিতাসের।
“আরে সবাই মানে আমাদের টিমের বাকিরা, তুই আয় তাড়াতাড়ি “। -ফোনটা কেটে দেয় অলি। তিতাসের বুকের ধুকপুকানি বাড়তে থাকে।
“আমাদের টিমের বাকিরা মানে, সাবর্ণ কি তাহলে এসেছে? কেমন আছে ও এখন, এখনো সেই আগের মতো প্রাণ খুলে পাগলামি করে? নাকি এখন সেলিব্রিটি সাবর্ণ অনেক রিজার্ভ,অনেক গম্ভীর, অনেক আলাদা? আচ্ছা এখনোও কি ও তিতাসেরই আছে, নাকি অন্য কেউ ওর জীবনে…..”
জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকায় তিতাস… দু বছর আট মাস চোদ্দো দিন আগে, দিনটা ছিলো বুধবার….

স্টুডিওর মেকাপরুমে বসে সাবর্ণকে ফোন করে তিতাস, বারদুয়েক ট্রাই করার পর busy আছে শুনে fb টা অন করে ঘাটতে শুরু করে, প্রায় মিনিট ১৫ পর সাবর্ণ ring back করে,
“তোমার আজ কটায় প্যাক আপ হবে তাসু? আজ আমি তোমাকে আনতে যাবো। তোমাকে একটা খবর দেওয়ার আছে আর সেটা আমি দেখা করে দিতে চাই”
“বাব্বা, হঠাৎ এরকম পাগলামি! কি এমন খবর?” মিষ্টি করে হেসে জানতে চায় তিতাস।
“না তাসু, আমি দেখা করেই বলবো, তোমাকে একবার দেখতে, তোমার কাছে একবার ছুটে যেতে খুব ইচ্ছে করছে আমার। বলো না কটায় প্যাক আপ হবে?”
“কার সাথে কথা বলছিলে বলোতো?”
“আরে সব বলবো তোমায়, কিন্তু গিয়েই বলবো”
“বেশ, নটার মধ্যে এসো।”

সেদিন বাকি সময়টা তিতাসও মন দিয়ে কাজ করতে পারেনি, সারাক্ষণ প্রচন্ড টেনশন হচ্ছিল, কি বলবে, কি হয়েছে এসব নিয়েই….. তারপর প্যাকআপ হতেই তড়িঘড়ি মেকাপরুমে গিয়ে মেকাপ তুলে চেন্জ করে দৌড়ে বাইরে এসে দেখে সাবর্ণ দাঁড়িয়ে আছে। সারামুখে এক অদ্ভুত আনন্দ, অদ্ভুত প্রশান

অদ্ভুত দীপ্তি।
“কি হয়েছে? কিগো, কি হয়েছে বলোনা” বাচ্চাদের মতো বায়না করতে শুরু করে তিতাস।

সাবর্ণ কিছুক্ষণ একটা প্রশান্তি নিয়ে তিতাসকে দেখে, তারপর হালকা হেসে দুহাত দিয়ে টেনে নেয় তিতাসকে, বুকের মধ্যে। তারপর বড়ো করে একটা নিশ্বাস নেয়। তিতাস মুখ তুলে সাবর্ণর দিকে তাকায়….
“আজ বড়ো পর্দার কাজের একটা কথা ফাইনাল হয়েছে তাসু…. কাদের প্রোডাকশন জানো? Theideas এর….ওরা ‘পাহাড়ে ব্যোমকেশ’ করছে,আর এরকম একটা বিগ বাজেটের film এ ওরা আমায় একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে select করেছে তাসু, আমি লেখকের মানে ব্যোমকেশের লেখক বন্ধুর চরিত্রে selected… Next month থেকেই কাজ শুরু হবে, ঐ মাস চার-পাঁচ মুসৌরিতে থাকতে হবে হয়তো। কিন্তু এই কাজটা ফাটিয়ে করতে হবে তাসু, এবার আমাদের সব স্বপ্ন পূরণ হবে।”
“পাঁচ মাস???? তুমি মুসৌরিতে থাকবে? আর আমাদের সম্পর্ক?” দুহাত দিয়ে সাবর্ণর কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় তিতাস।

“মানে? কি বলছো তুমি তাসু? সম্পর্কের সাথে কি হলো? এরকম একটা ভালো কাজ, ভালো চরিত্রের জন্য স্বপ্ন দেখেছি আমরা দিনের পর দিন!! “
“হ্যাঁ দেখেছি, কিন্তু তোমাকে আমি এখানেই কাজ করতে বলেছিলাম, কেন কোলকাতায় কাজ নেই? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?”
“এসব কি বলছো তুমি তাসু? খবরটা পাওয়ার পর সবার আগে তোমার মুখটা ভেসে উঠেছিল আমার চোখের সামনে, ছুটে এসেছি তোমার কাছে, দুজনে আনন্দ ভাগ করে নেবো বলে!!!”
“ভাগ করে নেবে কি করে? মুসৌরিতে গিয়ে?আমিতো যেতে পারবোনা, আমার কাজ চলছে এখানে। তুমি আমাকে বলেছিলে বড় পর্দার কাজ না করে মেগা করতে, কেন? আমি যাতে এখানেই থাকি। আর নিজে তো…… আমি যদি এতদিনের জন্য বাইরে চলে যেতাম….?”
“তুমি এরকম কেন করছো কেন তাসু? আমি তো কাজটার জন্য যাবো, শেষ হলেই তো তোমার কাছে ফিরে আসবো।” কাছে টেনে নিতে যায় সাবর্ণ তিতাসকে।
“প্লিজ, ভালোলাগছেনা এসব।”
“তুমি কি চাও তাসু? আমি অভিনয়টা ছেড়ে দি? “
“না সেটাতো বলিনি”।

” তাহলে কি বলছো তুমি তাসু? এই দুবছর ধরে তুমি দেখোনি যে এই দিনটার জন্য আমি, আমার মা-বাবা দিনেট পর দিন কষ্ট করেছি? তুমি জানো প্রত্যেকটা দিন কিভাবে কেটেছে আমার, আর আজ এই খবরটায় তুমি খুশী নও? “
“তুমি কোলকাতায় থেকেই কাজ করো, কোনো একটা মেগার কাজ….”
“সেটা আর সম্ভব নয় অভিনেত্রী তিতাস বাসু। আমি মনস্থির করেছি আমি কাজটা করবো আর আমি ওদের কথাও দিয়ে দিয়েছি। ” সাবর্ণর গলায় দৃপ্ততার সুর।
“ওওওওওওও, তাহলে তো আমাকে বলতে আসার কোনো প্রয়োজন ছিলোনা।” গলাটা অভিমানে কেঁপে যায় তিতাসের।
“বলতে এসেছিলাম কারণ তোমার সাথে আমার আনন্দটা ভাগ করে নেবো বলে। কিন্তু বুঝতে পারিনি যে তুমি চাও অভিনয়টা শুধু তুমি করবে, ফ্ল্যাশের ঝলকানি শুধু তোমার জন্য থাকবে, উন্নতির শিখরে শুধু তুমি পৌঁছাবে আর আমি তোমার পেছনে পরে থাকবো অন্ধকারে বা সারাজীবন যুদ্ধ করবো বর তোমার খ্যাতি দেখবো। সেটা হবেনা তিতাস, তুমি চলে যাও। কিন্তু এই কাজটা আমি করবোই।”
“সা-ব-র” কথা জড়িয়ে আসে তিতাসের।
“তুমি তো বলতে তিতাস, তুমি সেলিব্রিটির বৌ হয়ে থাকতে চাও, যাকে সবাই ছুঁতে চাইবে, কিন্তু সে তোমার থাকবে৷ আমি তো তোমারই ছিলাম তিতাস, তাহলে কেন এত পাল্টে গেলে? নাকি ওগুলো নাটক ছিলো?”
“আমি কিন্তু তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম….” অজানা আতঙ্কে বুক কেঁপে ওঠে তিতাসের।

“আর কিছু বোলোনা তিতাস, কারণ কাজটা আমি করছি। এটাই আমার শেষ কথা। খবরটা দেওয়ার জন্যই এসেছিলাম, চলি।” কথাটা বলেই সেদিন চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছিলো সাবর্ণ, তারপর কি ভেবে একমুহূর্ত থমকে যায়, তিতাসের দিকে ফেরে, তিতাসের হাত ধরে বুকের মধ্যে টেনে আরএকবার জড়িয়ে ধরেছিলো তিতাসকে, প্রায় সমস্ত শক্তি দিয়ে একবার চেপে ধরেছিলো বুকের মধ্যে। তারপর হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে পেছন ঘুরে চলে গেছিলো, আর একবারও ঘুরে তাকায়নি। তিতাস ওখানে দাঁড়িয়েছিলো অনেকক্ষণ, চোখের জলে ঝাপসা হয়ে গেছিলো সাবর্ণর চলে যাওয়া। ওই শেষ…… তারপর দু বছরে তিনটে মুভি রিলিজ করেছে সাবর্ণর, অভিনেতা হিসেবে আজ সাবর্ণ সফল, কিন্তু তিতাসের সাথে আর একবারও যোগাযোগ করেনি।

প্রচন্ড জোরে মাথাটা ঠুকে গেলো জানলার কাঁচে। “আহ্ কি করছো দীপু দা, দেখে চালাও” কপালটা ডলতে ডলতে একটু বিরক্তি নিয়েই বলে তিতাস।
“একটা গর্ত ছিলো, অন্ধকারে একদম বুঝতে পারিনি।” কাচুমাচু গলায় জবাব দেয় দীপু।
মোবাইল টা জালিয়ে টাইম দেখে তিতাস, ১২.৩০, অনেকটা রাত হয়ে গেলো,
“আর কতক্ষণ লাগবে গো?”
“আর বেশীক্ষণ না, আধঘন্টা মতো।”
অলির নাম্বারটা বের করে আরেকবার ফোন করে তিতাস,
“কোথায় তুই মা? সারারাত কি বসিয়েই কাটাবি? নাকি একটু বৌ কে জড়িয়ে শুতে দিবি?” কুশলের গলা।
“এতদিন তো অনেক জড়িয়ে শুলি, আজ নাহয় জেগেই থাক।”
“বা*, কোথায় আছিস তুই?”
“চলে এসেছি, আর আধঘন্টা।”
“ok,আয় তাড়াতাড়ি। টাটা।” ওপারে অপার নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
ফোনটা কোলের ওপর রেখে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো তিতাস। তিনবছর আগে অলির বিয়ের দিনটার কথা মনে পড়ে গেলো, সবাই মিলে একসাথে কি ভীষণ মজাটাই না হয়েছিলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *