আলেয়া (P1)

স্নান সেরে বেরিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো রিতশ্রী। ৪.৩০ বাজে, এমনিতে এই সময়টা অফিসেই কাটে ওর, আজ শরীরটা খুব খারাপ লাগছিলো, তাই team leader কে ফোন করে ছুটি নিয়েছে আজ রিতশ্রী। শৌণক বলেছিলো আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে ওকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে। যদিও রিতশ্রীর কাছে শরীর খারাপের কারণ অজানা ছিলো না, চারমাস হলো conceive করেছে ও, কিন্তু শৌণককে বলতে পারেনি কিছুই, কি করে বলতো, এইকটা মাস যেভাবে কাটছিলো………

বিকেলে শৌণকের সাথে ডক্টরের কাছে যাবে বলেই তৈরী হচ্ছিল রিতশ্রী। হঠাৎ ল্যান্ড ফোনটা বেজে ওঠে, বুকটা কেমন কেঁপে ওঠে ওর। আস্তে আস্তে ড্রয়িংরুমে গিয়ে রিসিভারটা তুলে কানে দিলো, ওপাশে শৌণকের গলা, “রিতা, আজ বাড়ি ফিরতে রাত হবে, আমাদের H.R, শ্রী সায়ক সেন একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে স্পট ডেড্, একটু আগেই খবর এসেছে। খুব বাজে ভাবে ফেঁসে গেছি রিতা, আজ যেতে পারছিনা। রাতে ফিরে বাকি কথা বলছি।” ঝড়ের মতো কথাগুলো বলে ফোনটা কেটে দিলো শৌণক। রিতশ্রী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো স্তম্ভিত হয়ে। শৌণকের কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আবার
ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো রিতশ্রী।

“সায়ক!!! সায়ক সেন স্পট ডেড!!! সত্যি!!!” নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেনা ও। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বড়ো করে একটা নিশ্বাস নিলো রিতশ্রী। এই কটা মাস যেনো বেঁচে থাকাটাই দূর্বিষহ হয়ে উঠেছিলো এই সায়কের জন্য। আজ হালকা লাগছে ভীষণ। খবরটা আসার পর এই কয়েক মূহুর্তেই বেশ অনেকটা সুস্থ মনে হলো নিজেকে। আজ শৌণক বাড়ি এলে ওকে খুব আদর করবে, তারপর ওকে জড়িয়ে ধরে ওর শরীর খারাপের সুখবরটা দেবে। ইস্, কতদিন হয়ে গেছে শৌণকের দিকে ভালো করে তাকিয়েও দেখেনি। খোলা চুলের ভেতর আঙুল দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে বেডরুমে ঢুকে আয়নার সামনে এসে বসলো রিতশ্রী। আজকের মতো সেদিনও ল্যান্ডফোনেই ফোনটা এসেছিলো, সেদিনের কথা মনে করেই বুকটা কেঁপে উঠলো ওর। প্রায় বছর দেড়েক আগে হবে…….

প্রতিদিনের মতোই সকালে উঠে চা খেয়ে স্নানে গেছিলো শৌণক, ওর মোবাইলে ফোন করে না পেয়ে ল্যান্ডফোনে ফোন করেছিলো ওদের অফিসের HR, কিছু জরুরি কথা বলার জন্যই। ফোনটা বাজছে শুনে কিচেন থেকে বেরিয়ে ফোনটা রিসিভ করে রিতশ্রী,
“হ্যালো”।
” মিঃ শৌণক পাল আছেন? ওনার মোবাইলে ওনাকে পাচ্ছিনা,তাই…..”
বুকটা ছ্যাঁত করেছিলো প্রথমদিনই ওই গলাটা শুনে, ভীষণ চেনা চেনা!! কার গলা এটা!!! অনেক আগে কোথায় যেনো শুনেছে…. চাপা উত্তেজনায় দমন করতে পারেনা রিতশ্রী, “কে? কে বলছেন আপনি?”
“আমি সায়ক,সায়ক সেন। the HR of infotech associaton. আপনি?”
“সায়ক!!! মানে 2008 engineering? Gis College? “
“হ্যাঁ, কিন্ত আপনি?”
“সায়ক, আমি ঋ……”

সেই শুরু। তারপর থেকে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে যখন তখন সায়কের ফোন আসা শুরু হয়েগেছিলো রিতশ্রীর এর মোবাইলে, সেই আগের মতো………
একদিন সায়কের জোরাজুরিতে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে একসাথে কফি শপে গেলো ওরা। রিতশ্রীর যদিও ইচ্ছে ছিলোনা একদম, ও বলেছিলো বারবার, “আমাদের দূরাভাষের বন্ধুত্বই থাক না সায়ক।”

কিন্তু সায়ক নাছোড়বান্দা। অফিসের মধ্যে, বাড়িতে বারবার ফোন করে একই কথা বলতে থাকে। অবশেষে রিতশ্রী বাধ্য হয়েই রাজী হয়। সায়কের সাথে বিশাল বড়ো ঝকঝকে কফি শপে বসে অনেকদিন পর একটা সুন্দর সন্ধ্যা কাটিয়েছিলো ঋ। তারপর থেকে সপ্তাহে তিন-চারদিন দেখা হওয়াটা অভ্যেস হয়েগেছিলো ওর।যদিও বিয়ের পর থেকেই তো সংসারের হাল ঠেলা আর বিয়ে না হওয়া এক স্বেচ্ছাচারী ননদের হুকুম তামিল করতে করতে জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো রিতশ্রীর, তাই সায়কের সাথে এই মূহুর্তগুলো হয়ে উঠেছিলো মুক্তির আশ্বাস। ১১বছর আগে সায়ককে ভালোবেসে একটা সুন্দর স্বপ্নের সংসার সাজাতেই তো চেয়েছিলো ঋ।

ঋ নামটা সায়কেরই দেওয়া ছিলো, 2008 এ Gis college এ engineering পড়তে গিয়েই সায়কের সাথে বন্ধুত্ব তারপর প্রেম। প্রেম বলতে ঋ প্রথম দিন থেকেই পাগল ছিলো সায়কের জন্য, ফুল crush খাওয়া যাকে বলে। বন্ধুরা তো সবাই প্রায় জানতো, অনেকবার সায়ক কে বলার চেষ্টাও করেছিলো ঋ, কিন্তু ওর সামনে গেলেই কেমন যেনো সব তালগোল পাকিয়ে যেতো। বন্ধুরা কেউ কিছু বলেছিলো কিনা জানেনা ঋ, কিন্তু কলেজের দ্বিতীয় বছর ভ্যালেন্টাইনস্ ডে তে সায়ক এক থোকা লাল গোলাপ দিয়ে ঋ এর সামনে হাঁটু মুড়ে প্রেম প্রোপোজাল দিয়েছিলো যেদিন, তারপর থেকে সিনেমার মতো লাগছিলো ঋ এর জীবনটা। কলেজের চার বছর চুটিয়ে প্রেম, সিনেমা দেখা, প্রচুর ঘোরা, কলেজ এসকারশান…..

ফোর্থ ইয়ারের final exam এর পর কলেজ এসকারশানে ভাইজ্যাক গেছিলো ওরা, ওদের ভাইজ্যাকে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়েই সায়ক বলেছিলো,
“আজ থেকে তোকে ঋ বলে ডাকবো। তোর ঠোঁটটা ভীষণ সুন্দর জানিস! তোর ঠোঁটের মাঝে,তোর শরীরের গভীরতায় হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে খুব। আজ রাতে তোর জন্য অপেক্ষা করবো ছাদে, যদি আসিস বুঝবো তুই সারাজীবনের জন্যই আমার। “
সেদিন গভীর রাতে সকলের অজান্তে ঋ ছুটে গেছিলো হোটেলের ছাদে।

To be continued…

Written by Meghbalika

Submit your review
1
2
3
4
5
Submit
     
Cancel

Create your own review

Our Stories
Average rating:  
 0 reviews